শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

আব্দুল্লাহ : উপন্যাসের বাস্তবতা ও বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান পর্ব

ইনামুল করিম

মানব বৃক্ষের অস্তিত্ব ত্রিমাত্রিক সত্ত্বায় ক্রিয়াশীল পানির অস্তিত্বে যেমন নদী প্রবাহমান তেমনি ভূমিকায় ত্রিমাত্রিক সত্ত্বা সক্রিয়। এই তিনটি মাত্রা ছিল স্থানিক, কালিক ও মূল্যবোধ বা মতাদর্শ। এদের মধ্যে কালিক মাত্রা ও মূল্যবোধ নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় বর্তমান। কার্যত মানব বৃক্ষের জীবন-প্রবাহ স্থান ও সময়ের বৃত্ত আবর্তিত। কোনো একটি ঘটনা ঘটে অন্য একটি ঘটন ার আগে অথবা পরে। এই চিন্তাটি আমাদের চেতনায় সক্রিয় থাকে। আমাদের কথাও কাজের মৌল ভিত্তি হচ্ছে এই অনুমান বা সময় চেতনা। সময় পরিবর্তনশীল বলে আমাদের সময় চেতনাও পরিবর্তনশীল। স্থানিক মাত্রা হলো আমাদের পরিবেশ, জীবন-জীবিকার পরিবেশ। এটাও সময়ের ¯à§à¦°à¦¾à§‡à¦¤ পরিবর্তনশীল। এই স্থানিক ও কালিক মাত্রা ভিন্ন মানবীয় জীবন-জমিনে আরো একটি পরমাণু ক্রিয়াশীল সেটা হলো জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যবোধ তথা মতাদর্শ। এটাকে মিনিট বা ঘণ্টা হিসেবে পরিমাপ করা অসম্ভব ক্রিয়া।

মানব বৃক্ষের বাস্তবতা স্থানিক পরিবেশে দুটি জীবন-প্রবাহকে প্রস্ফুটিত করে থাকে। একটি হলো কালিক বৃত্তাবদ্ধ জীবন এবং অপরটি হলো মূল্যবোধের অন্তর্গত জীবন প্রবাহ। বাস্তব জীবনের ঘটনা প্রবাহ উপন্যাস সৃষ্টির ভ্রƒà¦£à§‡ সক্রিয় থাকায় উপন্যাসের বাস্তবতা মানব জীবনের উপরোক্ত দ্বৈতসত্ত্বাকে ধারণ করে থাকে। কার্যত একজন ঔপন্যাসিক স্থানিক-কালিক বাস্তবতা ও মূল্যবোধের বৃত্তের বাইরে যেতে ব্যর্থ। বস্তুত শিল্পীসত্ত্বা বাস্তবতাকে অতিক্রম করতে পারেন না।

বাস্তবতা হলো প্রকৃতি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়ে থাকে। অপরদিকে সামাজিক সম্পর্কের জগৎই বাস্তবতার একমাত্র উপাদান। বাস্তবতা থেকে বিশিষ্ট একটি আক্ষরিক চিত্র অচিন্তনীয় এবং একটি চিত্র যা বাস্তবাকে নির্দিষ্ট সীমার বাইরে বিকৃত করে তা কার্যকারিতা বর্জিত এক সত্ত্বা। বাস্তবতার প্রতিফলনের অনিবার্য উপাদানগুলো অন্যান্য ধরনের কাজের অধীন হওয়া অস্বাভাবিক নয় এবং কাজগুলোর সাথে এতটাই কাঠামোবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বর্তমান যাতে করে কাজটির বাস্তববাদী চরিত্র হারিয়ে যাওয়া একটি অনিবার্য ক্রিয়া।

বাস্তববাদী সাহিত্যের জমিনে তথা উপন্যাসের বাস্তবতার কাঠামোতে দুটি সত্ত্বা পৃথিবীর আহ্নিক ও বার্ষিক গতির অস্তিত্বে ক্রিয়াশীল একটি হলো বস্তুগত ও কালিক জগৎ এবং অপরটি হলো ঔপন্যাসিকের মানস-জমিন তথা তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। এই দুটি সত্ত্বার রাসায়নিক ক্রিয়ায় উপন্যাসের বাস্তবতা সৃষ্টি হয়ে থাকে। একটি উপন্যাসে শুধু বাস্তব জগতের বস্তুগণ বর্ণনাই থাকে না, এর সাথে ঔপন্যাসিকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বাস্তব ঘটনা প্রবাহের বিশ্লেষণ এটা উপন্যাস সৃষ্টির ভ্রƒà¦£ হিসেবে বিশেষ ভূমিকায় ক্রিয়াশীল। কার্যত উপন্যাসে বিদ্যমান বাস্তবতার প্রতিচিত্র অঙ্কিত হয় না। যেটা হয়ে থাকে সেটা হলো বাস্তবতার পুনর্নির্মাণ। কার্যত উপন্যাস বুননের অন্তর্জগতে একজন ঔপন্যাসিক কখনোই সময়ের প্রবাহমানকে অস্বীকার করতে পারেন না। সময়ের ঘড়িকে ঔপন্যাসিকের পছন্দ না-ও হতে à¦ªà¦¾à¦°à§‡Ñ à¦¤à¦¿à¦¨à¦¿ সময়ের বিপ্রতীপ ¯à§à¦°à¦¾à§‡à¦¤à§‡ যেতে পারেন কিংবা সময়ের প্রেক্ষাপটে রূপান্তরের ক্রিয়ায় সক্রিয় হতে পারেন। সে প্রেক্ষাপটে ঔপন্যাসিক হিসেবে কাজী ইমদাদুল হক সময়ের প্রবাহমানতাকে ধারণ করেই তার ‘আব্দুল্লাহহ’ উপন্যাসটি সৃষ্টি করেছেন।

উপরোক্ত প্রবাহমানতাকে এই উপপাদ্য প্রস্ফুটিত যে, বাঙালি মুসলিম শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থাপন পর্বের দলিল হলো ‘আব্দুল্লাহহ’। উপন্যাসটির স্থানিক কালিক মাত্রা হলো বৃটিশ শাসনাধীন বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ।  কালিক মাত্রা হলো বিশ শতকের প্রথমদিকের ঔপনিবেশকালীন সময়। বাস্তবতা ধারণা করেছে যদিও সেটা আংশিক। ‘আব্দুল্লাহহ’ উপন্যাসের মানচিত্রে বাঙালি মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতার সাথে ইংরেজি তথা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও আগ্রহী বিকাশমান মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যেমন করে একজন কৃষক জমিনে ফসল উৎপাদন করে থাকেন। আর সে বাস্তবতা এখানে অনুপস্থিত সেটা হলো রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সা¤à§à¦°à¦¾à¦œà§à¦¯à¦¬à¦¾à¦¦ বিরোধিতা। ঊনিশ শতকের বাঙালি হিন্দু বাবুশ্রেণির মতো শিক্ষিত বাঙালি মুসলিম সমস্ত সংস্কৃতির বিরোধিতা করেছিল সত্য। কিন্তু বৃটিশ ঔপনেবিশক শাসক শ্রেণিকে বিরোধী শক্তি ভাবেননি। বিশ শতকের প্রথম দিকের মুসলিম সমাজের মানসিকতা à¦›à¦¿à¦²Ñ à¦¬à§ƒà¦Ÿà¦¿à¦¶ শাসকশ্রেণি থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নেওয়া; বিশেষ করে শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে। ‘আব্দুল্লাহহ’ উপন্যাসে মুসলিম মানসিকতার এই দিকটাই প্রস্ফুটিত হয়েছে।

২. বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে বুঝা যায় যে, কাজী ইমদাদুল হক ‘আব্দুল্লাহহ’ উপন্যাসটি চল্লিশটি অধ্যায়ে শেষ করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সেটা করে যেতে পারেননি। কারণ এর মধ্যে তার মৃত্যু ঘটে। তিনি জীবিত থাকতেই  এই উপন্যাসের প্রথম ত্রিশ অধ্যায় মাসিক মোসলেম ভারত’ সাময়িকীতে ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী দুটি অধ্যায় তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু ‘মোসলেম ভারত’-এর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অধ্যায় দুটি আর প্রকাশের মুখ দেখতে পায়নি। কাজী ইমদাদুল হকের মৃত্যুর পর কাজী আনোয়ারুল কাদির, কাজী ইমদাদুল হকের করা খসড়ার উপর ভিত্তি করে শেষ এগারটি অধ্যায় লিখে উপন্যাসটি শেষ করেন।

‘আব্দুল্লাহহ’র রচনাকাল সম্পর্কে কাজী আব্দুল অদুদ মন্তব্য করেছেন। “১৯১৮ সালে কঠিন অস্ত্রোপচার এরপর কাজী ইমদাদুল হক সাহেবকে দীর্ঘদিন হাসপাতালবাস স্বীকার করতে হয়। তার ‘আব্দুল্লাহ’ সেই বাসকালে রচিত।”

(চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ